ভা’রত থেকে টিকা এনে ভা’রতকেই পেছনে ফেলল বাংলাদেশ

বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ১৬ কোটির বাংলাদেশে টিকা দেয়া হয়ে গেছে সাড়ে ১৮ লাখের বেশি। শতকরা হিসাবে তা মোট জনসংখ্যার ১.১৫ শতাংশের মতো। কিন্তু ১৩৫ কোটি জনসংখ্যার দেশটিতে টিকা দেয়া হয়েছে এক কোটি দুই লাখের কিছু কম মানুষকে। শতকরা হিসাবে তা ০.৭৫ শতাংশের মতো।

ভা’রত থেকে করো’নার টিকা এনে প্রয়োগে উৎপাদক দেশটিকেই পেছনে ফেল দিল বাংলাদেশ।

ভা’রতে টিকার প্রয়োগ চলছে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে। সেখানে টিকাদান শুরু হয় ১৬ জানুয়ারি। বাংলাদেশে প্রয়োগ করা হয়েছে ১০ দিন মাত্র। ২৭ জানুয়ারি উদ্বোধন হলেও গত ৭ ফেব্রুয়ারি শুরু হয় গণ প্রয়োগ।

বাংলাদেশে এরই মধ্যে মোট জনসংখ্যার এক শতাংশের বেশি মানুষকে টিকা দেয়া হয়ে গেছে। কিন্তু ভা’রত এখনও এক শতাংশের কাছাকাছি নেই।

বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ১৬ কোটির বাংলাদেশে টিকা দেয়া হয়ে গেছে সাড়ে ১৮ লাখের বেশি। শতকরা হিসাবে তা মোট জনসংখ্যার ১.১৫ শতাংশের মতো।

কিন্তু ১৩৫ কোটি জনসংখ্যার দেশটিতে টিকা দেয়া হয়েছে এক কোটি দুই লাখের কিছু কম মানুষকে। শতকরা হিসাবে তা ০.৭৫ শতাংশের মতো।

বাংলাদেশের মতো ভা’রতেও টিকা নিয়ে অবিশ্বা’স, স’ন্দেহ দানা বাঁধে শুরুতে। এ কারণে সরকার যত ভেবেছিল, তত টিকা দেয়া যায়নি এখনও।

বাংলাদেশে টিকা আসার পর থেকেই এ নিয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নানা কথা বলাবলি হচ্ছিল। দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপির পক্ষ থেকে টিকা নিতে নিরুৎসাহিত করা হয়। বলা হয়, এই টিকা নিয়ে মানুষ মা’রা যাবে।

টিকা এনে ভা’রতকেই পেছনে ফেলল বাংলাদেশ
রাজধানীর মুগদা হাসপাতা’লে টিকা নিতে আসা মানুষের সারি। ছবি: নিউজবাংলা
এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকা দলটির মুখপাত্র রুহুল কবির রিজভী এমনও বলেন, করো’নার টিকা দিয়ে সরকার বিএনপিকে মে’রে ফেলতে চায়।

তবে টিকা প্রয়োগ শুরু হওয়ার পর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ন্যূনতম পর্যায়ে থাকা আর যে সমস্যা সেগুলোও ধর্তব্যের মধ্যে না পড়ার পর দিনে টিকা প্রয়োগ ৩১ হাজার থেকে দুই লাখ ৬১ হাজার পৌঁছতে সময় লাগেনি ১০ কার্যদিবস।

ভীতি কমে যাওয়ার আরেক প্রমাণ মেলে টিকার জন্য নিবন্ধনে। প্রথম এক লাখ নিবন্ধন হতে যেখানে এক সপ্তাহেরও বেশি সময় লেগে যায়, সেখানে পরের দুই সপ্তাহ নিবন্ধন ছাড়িয়ে গেছে ২৫ লাখ।

বিএনপিও এখন অবস্থান পাল্টেছে। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইস’লাম খান বলেছেন, তারা টিকা নেবেন না এ কথা কখনও বলেননি।

শুক্রবার রাজধানীতে একটি সংলাপেও টিকা প্রয়োগে বাংলাদেশের এই সাফল্যের বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন বিশেষজ্ঞরা।

জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রধান বৈজ্ঞানিক কমক’র্তা এ এস আলমগীর বলেন, ‘করো’না প্রতিরোধে পৃথিবীর অনেক দেশেই টিকা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। খুব অল্প দেশই মোট জনসংখ্যার এক শতাংশের টিকা দেয়ার কাজ সম্পন্ন করেছে। আবার আমাদের আগে ভা’রতের টিকা কার্যক্রম শুরু হলেও জনসংখ্যা বেশি বিধায় ভা’রতেও ওই টার্গেটে যেতে পারেনি তারা।’

টিকা এনে ভা’রতকেই পেছনে ফেলল বাংলাদেশ
টিকা নিতে আগ্রহীরা নিবন্ধন করছেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতা’লে
বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশনের মিলনায়তনেকরো’না সংক্রমণের গতিবিধি ও টিকা’ শীর্ষক সংলাপে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন তিনি।

এর আয়োজন করে স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা সাংবাদিকদের সংগঠন বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরাম, বিএইচআরএফ।

এ এস আলমগীর বলেন, ‘বিশ্বে ১৫টির বেশি দেশ মোট জনসংখ্যার এক শতাংশের বেশি টিকার আওতায় আনতে পেরেছে।’

তবে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে যু’ক্তরাজ্য। দেশটির মোট জনসংখ্যার ২৩ শতাংশ এরই মধ্যে টিকা পেয়ে গেছেন।

বাংলাদেশ প্রত্যাশার বেশি টিকা পাবে

বাংলাদেশ এরই মধ্যে ভা’রতের সিরাম ইনস্টিটিউট থেকে তিন কোটি ৪০ লাখ টিকা কিনেছে। প্রতি মাসে আসবে ৫০ লাখ করে। এর বাইরে ভা’রত সরকার উপহার দিয়েছে ২০ লাখ।

এর বাইরে বিশ্বজুড়ে ন্যায্যতার ভিত্তিতে টিকা বিতরণে গড়ে উঠা জোট কোভ্যাক্স থেকে আরও ছয় কোটি ৭০ লাখ টিকা পাওয়ার নিশ্চয়তা পেয়েছে বাংলাদেশ।

এই জোট নিম্ন আয়ের প্রতিটি দেশের জনসংখ্যার ২০ শতাংশের জন্য টিকা দেবে।

টিকা এনে ভা’রতকেই পেছনে ফেলল বাংলাদেশ
টিকা নিতে নিবন্ধন করে তালিকায় নিজের নাম দেখছে মানুষ। ছবিটি ঢাকার কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল থেকে তোলা
ড. আলমগীর জানান, এই প্রত্যাশার চেয়ে বেশি টিকা পাওয়া যাবে। তিনি বলেন, ‘কোভ্যাক্স থেকে মোট জনগোষ্ঠীর ২০ শতাংশকে টিকা সরবরাহ করার আশ্বা’স দেয়া হয়েছিল। তবে এটি বেড়ে ২৭ শতাংশ হতে পারে।’

গত এক মাস ধরে পরীক্ষার বিপরীতে টিকার সংক্রমণ ৫ শতাংশের কম থাকা নিয়েও আলোচনা হয় সেমিনার।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নীতিমালা অনুযায়ী টানা দুই সপ্তাহ পরীক্ষার বিপরীতে শনাক্তের হার ৫ শতাংশের নিচে হলেই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে ধ’রা হয়।

ড. আলমগীর বলেন, ‘আম’রা স্বস্তির একটি পরিবেশে আছি।’

তবে এ নিয়ে উচ্চাশা ও স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রে ছাড় দেয়া যাবে না বলেও সতর্ক করেন এই বিজ্ঞানী। বলেন, ‘বিশ্বের অনেক দেশেই সংক্রমণের হার কমা’র পরে পুনরায় তা বেড়েছে।

টিকা এনে ভা’রতকেই পেছনে ফেলল বাংলাদেশ
করো’নার টিকা প্রয়োগ নিয়ে রাজধানীতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সেমিনার
‘তাই আমাদের ঢিলেমি দিলে চলবে না। টিকা নেয়ারা পাশাপাশি মাস্ক পড়া, ঘনঘন সাবান পানি দিয়ে হাত ধোয়া, জনসমাবেশ এড়িয়ে চলার মতো স্বাস্থ্যবিধিগুলো আমাদের মানতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে টিকা মৃ’ত্যু কমাবে। করো’না সংক্রমণ প্রতিরোধে টিকা একটি অন্যতম পন্থা, একমাত্র পন্থা নয়।’

সংলাপে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহও বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন, ‘সংক্রমণ কমে এসেছে তা স্বস্তির খবর। কিন্তু আত্মতুষ্টিতে ভোগার কোনো সুযোগ নাই।’

তিনি বলেন, ‘মৃ’ত্যুর মিছিল উঠা নামা করছে। এখন অনেকেই আমাদের দেশে আসবে। ভাই’রাসটি যাতে আম’দানি হয়ে না আসে সেই বিষয়ে সজাগ থাকতে হবে।’

এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘টিকা দেয়ার পাশাপাশি মাস্কও পরতে হবে। দুটি মাস্ক পড়লে তা আরো বেশি কার্যকর বলে বলা হচ্ছে।’

করো’না প্রতিরোধে জাতীয় কারিগরি পরাম’র্শ কমিটির সদস্য অধ্যাপক ইকবাল আর্সালান বলেন, ‘সংক্রমণ কমলেও ঝুঁ’কিমুক্ত হইনি। ভবিষ্যতে ঝুঁ’কির আশ’ঙ্কা আছে।’

রাজনৈতিকসহ নানা জনসমাবেশের বিষয়টি টেনে সতর্ক করেন তিনি। বলেন, ‘ভবিষ্যতে সংক্রমণের ঝুঁ’কি থেকে নিরাপদ থাকতে এই জনসমাবেশ বন্ধের বিষয়ে সরকারের মনোযোগ দিতে হবে।’

একুশে পদকপ্রাপ্ত অনুজীব বিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. সমীর কুমা’র সাহা বলেন, ‘দেশে করো’না সংক্রমণ শুরুর আগেই আমাদের সিকোয়েন্সিংয়ের মেশিন ছিল। কিন্তু এই কাজে আম’রা সফলতা দেখাতে পারিনি। কিন্তু করো’নাকালে সবাই মিলে যখন কাজটি শুরু করি তখন বড় একটি কাজ হলো। এই বিষয়ে আমাদের আরও বেশি মনযোগ দিতে হবে।’