রাস্তায় শাক বেচে ছেলেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াচ্ছেন মা

ঘরে রান্না করার মতো কোনো তরকারি ছিল না। কুমড়া পাড়তে আমগাছে উঠেছিলেন স্বামী মো. কালাম (৪৫)। অসাবধানতায় গাছ থেকে পড়ে যান তিনি। ভেঙে যায় তার পা। এতে চরম দুর্দিন নেমে আসে পরিবারে। সংসারের হাল ধরেন স্ত্রী সিমা বেগম (৪০)। স্বামীর চিকিৎসা, সন্তানদের পড়াশোনা এবং পরিবারের দুবেলা খাবারের সংস্থানে নেমে পড়েন জীবনযুদ্ধে।

কালাম-সিমা দম্পতি রাজশাহী নগরীর শ্রীরামপুর পদ্মাপাড়ের বাসিন্দা। তাদের তিন ছেলে মেয়ে। বড় ছেলের নাম হাসান আলী জমিম (২৪)। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) বাংলা দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী তিনি। করোনার কারণে তার পড়ালেখা থমকে আছে।

মেধাবী জসিম জিপিএ-৫ পেয়ে নগরীর বুলনপুর ইউসেফ স্কুল থেকে এসএসসি পাস করেন। একই স্কুল থেকে অষ্টম শ্রেণিতেও জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন তিনি। রাজশাহীর নিউ গভ. ডিগ্রি কলেজ থেকে মানবিক বিভাগে জিপিএ-৫ পেয়ে এইচএসসি পাস করেন জসিম।

ছোট ছেলে সাব্বির হোসেনের (২০) পড়ালেখা চালাতে পারেননি কালাম। একই কারণে মেয়ে জেসমিন আক্তার ক্রিপার (২২) পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যায়। পরে তার বিয়ে দিয়ে দেন। বড় ছেলেকে ঘিরেই সব স্বপ্ন কালাম-সিমা দম্পতির।

বাড়ির পাশের রাস্তায় ভোর ৬টা থেকে শাক নিয়ে বসেন সিমা বেগম। ধুয়ে, বেছে এমনকি কেটেও দেন শাক। ক্রেতারা নিয়ে গিয়ে শুধু রান্না করেন। রকমভেদে প্রতি কেজি শাক বিক্রি হয় ৫০ থেকে ৬০ টাকায়। পদ্মার চরের ক্ষেত থেকে শাক তুলে এনে প্রতিদিন রাস্তায় বসেন সিমা। রাত পর্যন্ত তিনি শাক বিক্রি করেন।

মঙ্গলবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৮টার দিকে বাড়ির পাশের রাস্তায় পাওয়া গেল সিমা বেগমকে। ওই সময় তিনি শাক কাটছিলেন। কাজের ফাঁকে ফাঁকে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলেন তিনি।

সিমা বলেন, একদিন বাইরের কাজ সেরে বাড়ি ফেরেন স্বামী। আমি বললাম- ঘরে তরকারি নেই। স্বামী বললেন- আমগাছে একটা কুমড়া আছে, পেড়ে আনি। এরপর তিনি কুমড়া পাড়তে আম গাছে ওঠেন। অসাবধানতায় পড়ে যান। কিন্তু কিভাবে পড়লেন জানেন না। তাকে তোলার সময় পায়ে একটির শব্দ হলো। সঙ্গে সঙ্গে পা ফুলে গেল। তার জ্ঞান নেই। মাথায় পানি ঢালার পর জ্ঞান ফিরলো তার।

সিমা জানান, গুরুতর আহত স্বামীকে নিয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে গেলেন । তখন তাদের হাতে কোনো টাকা-পয়সা ছিল না। অবস্থা দেখে এক বন্ধু ৫০০ টাকা দিলেন। সেই টাকা দিয়ে শুধু ছবি তোলা হলো, ওষুধ হলো না। ওই বন্ধু আরও ৫০০ টাকা দিলেন। সেই টাকায় কিছু ওষুধ কিনে দিয়ে তিনি স্বামীকে হাসপাতালে রেখে বাড়ি ফিরলেন।

তিনি বলেন, দীর্ঘদিন আমার স্বামী হাসপাতালে ছিলেন। এক সময় চিকিৎসক জানালেন, পা কেটে ফেলতে হবে। খরচা হবে ৩১ হাজার টাকা। সেই টাকা আমি যোগাড় করতে পারিনি।

সিমা জানান, তারা স্বামী-স্ত্রী স্থানীয় একটি খামারে কাজ করতেন। বাড়িঘর হারিয়ে সেখানেই পরিবার নিয়ে থাকতেন। খামার মালিকের কাছে স্বামীর চিকিৎসার জন্য সহায়তা চান। মালিক দুই হাজার টাকা দেন। সেই টাকা দিয়ে ওষুধ কেনেন তিনি। এই অল্প টাকার ওষুধে কিছুই হলো না। তার স্বামী ভাঙা পা নিয়ে হাসপাতালেই পড়ে থাকলেন। আট দিনের দিন তিনি স্বামীকে হাসপাতলে রেখে বাড়ি ফেরেন। বাসায় খাবার নেই। ছেলে-মেয়েদের নিয়ে কষ্টের শেষ নেই।

পদ্মা নদীর পাড়েই তার বাসা। দেখলেন- এলাকার অনেকেই পদ্মাপাড়ে শাক তুলছেন। খাবার জন্য তিনিও তুললেন। তিন-চার কেজি হলো। নিজেদের তোলা শাক নিয়ে মহল্লার নারীরা পদ্মা পাড়ে বসেন। তাদের দেখা দেখি সকালে তোলা শাক নিয়ে বিকেলে পদ্মার বাঁধের ওপরের রাস্তায় বসলেন। দেড়শ টাকায় বিক্রি হলো শাক। শাক বিক্রির টাকা নিয়ে হাসপাতালে গেলেন। পুরো টাকা দিয়েই ওষুধ কিনলেন। একটা ইনজেকশন দেওয়া হলো। সেটি দিলেন। এরপর আর টাকা নেই। হাসপাতালে রাত কাটিয়ে পরদিন ফের বাসায় ফিরলেন।

সিমা বেগম বলেন, সেদিন বাসায় খাবার ছিল না। স্বামীর চিকিৎসাও করাতে হবে। ফের খামার মালিকের কাছে টাকা চাই। নেই নেই বলেও দুই হাজার টাকা হাতে দিলেন মালিক। সেই টাকায় কিছু ওষুধ-স্যালাইন কিনলাম।

তিনি আরও জানান, তার বড় ছেলে ও মেয়ে একসঙ্গেই পড়ালেখা করতো। তাদের বাবার দুর্ঘটনার সময় তারা দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী। পরীক্ষার ফরম পূরণ চলছিল। ছেলে-মেয়ে ফরম পূরণের টাকা চাইলে তিনি শিক্ষকদের গিয়ে বলতে বলেন- ‘বাবা হাসপাতালে, হাতে টাকা নেই। আমাদের পরীক্ষা দিতে দেন। পরে টাকা দিয়ে দিব।’ শিক্ষকরা রাজি হলেন না। ছেলে-মেয়ে বাড়ি ফিরে কান্নাকাটি শুরু করে। ওই সময় কোনো উপায় ছিল না। শেষে একটি এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে ছেলের ফরম পূরণ করা হয়। বাদ পড়ে যায় মেয়ে। পরে মেয়ের বিয়ে দিয়ে দেন।

সিমা জানান, বর্তমানে তার ছেলে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। স্বামী সুস্থ হওয়ার পর চার্জার রিকশা চালাচ্ছেন। তিনি আগের মতই শাক-পাতা বেচে স্বামীর সঙ্গে সংসারের হাল ধরেছেন। ছেলের পড়ালেখা চালাচ্ছেন। কষ্ট হলে ঋণ নিচ্ছেন। দুজনের আয় থেকে ঋণ পরিশোধও করছেন। ছেলের পড়ালেখা শেষ হতে আরেক বছর আছে। করোনার জন্য আটকে আছে পড়ালেখা। তিনি তার মেধাবী ছেলের চাকরি চান। ছেলে চাকরি পেলে তার দুর্দিন ঘুচবে। সংসারে সুখ ফিরবে।

যথন সিমা বেগমের সঙ্গে কথা হচ্ছিল তখনই তার স্বামী মো. কালাম চার্জার রিকশা নিয়ে এসে পাশের সড়কে থামলেন। এ নিয়ে কথা হয় তার সঙ্গেও।

কালাম জানান, তিনি একেবারেই সহায় সম্বলহীন। পরিবার নিয়ে বাস করতেন সিটি করপোরেশনের দেয়া শ্রীরামপুর পদ্মাপাড়ের গুচ্ছগ্রামে। ভাঙনে সেই অংশটুকু পদ্মায় চলে যায়। এরপর আশ্রয় হারিয়ে ফেলেন তারা। ওই সময় তিনি এলাকার একটি খামারে কাজ করতেন। সেই খামার বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর মালিক পরিবার নিয়ে তাদের সেখানে থাকতে দেন। এখনও তারা সেখানেই বাস করছেন। সেখান থেকেই তিনি দুর্ঘটনায় পড়েন।

তিনি আরও জানান, চিকিৎসক জানিয়েছিলেন। পুরোপুরি চিকিৎসায় তার ৮০ হাজার টাকা খরচ হবে। কেটে ফেলতে হবে পা। ওই সময় পুরো চিকিৎসা নিয়ে তিনি ও তার পরিবার দুশ্চিন্তায় পড়ে যান। পরে তিনি হাসপাতাল ছেড়ে আসেন। এরপর নাটোরে এক কবিরাজের কাছে যান। সেখানে কবিরাজ গাছগাছড়া দিয়ে পা বেঁধে দেন। এতে ভাঙা পা জোড়া লাগলেও ছোট হয়ে যায়।

এরপর তিনি সুস্থ হলেও স্বাভাবিক হতে পারেননি। এখনও তাকে নিয়মিত ওষুধ খেতে হয়। ভারী কোনো কাজও করতে পারেন না। তার স্ত্রীর সামান্য আয়েও সংসার চলে না। বাধ্য হয়ে তিনি চার্জার রিকশা চালাচ্ছেন। প্রতি দিনের আয় থেকে ৩০০ টাকা রিকশা মালিককে জমা দিতে হয়। দিনে হয়তো ২০০-৩০০ টাকা থাকে। স্বামী-স্ত্রীর আয়ে সংসার চলছে। কষ্ট করে ছেলের পড়ালেখাও চালাচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রীর কাছে ছেলের চাকরি চান কালাম।