Wednesday , September 22 2021

সে রাতে হাঁস বৃষ্টি হয়েছিল যে কারণে

১৯৪০ সাল, চলছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। বছরের শেষ হতে চললো। জাঁকিয়ে শীত পড়েছে কানাডার ফোম লেক অঞ্চলে। একে তো শীত, অন্যদিকে শত্রুদের বোমার ভয়। মানুষ ঘর থেকেই বের হন না খুব একটা। দিনটি ৪ নভেম্বর, হঠাৎ করেই ধুপধাপ শব্দে ঘুম ভেঙে যায় বাসিন্দাদের। মনে হচ্ছে ঘরের চালে কিছু একটা পড়ছে অনবরত। সবাই মনে করছিল হয়তো শিল পড়ছে। কেউ সাহস করে বাইরেও আস্ত পারছিল না।

ঘণ্টা খানিক পর যখন শব্দ থেমে গেল, তখন সবাই বাইরে এসে পুরাই থ! বৃষ্টি, শিল কিছুই না। আস্ত হাঁস পড়ে আছে চারদিকে। দুই একটা ছাড়া সবই মৃত। এমনই এক রাতের সাক্ষী হয়েছিলেন কানাডার ফোম লেক, শোহা এবং এলফ্রস অঞ্চলের মানুষ। পাঁচ হাজার হাসের মৃত অবস্থায় পাওয়া যায় পুরো অঞ্চলে। সবই একই প্রজাতির হাঁস। এমন ঘটনা চাক্ষুস তো দূরে থাক, কেউ কখনো রূপকথার গল্পেও শোনেনি। স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষ প্রথমে আতঙ্কিত হয়ে ওঠে। তারা ভেবে পায় না আসল ব্যাপারটি কি ঘটছে!

আসলে সেই রাতে ‘হাঁস-বৃষ্টি’ হয়েছিলে। বৃষ্টির মতো আকাশ থেকে হাঁস এসে পড়েছিল রাতে। একটি বা দুটি নয়। প্রায় পাঁচ হাজার হাঁস। তা-ও আবার সবগুলো একই প্রজাতির- বাফেলহেড হাঁস। পরেরদিন স্থানীয় এক পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল ‘এখানকার মানুষজনের পাতে আগামী এক সপ্তাহ হাঁসের মাংস থাকবে। কেউ এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে না’। বেশ কয়েকদিন আলাপ-আলোচনার পর স্থানীয় মানুষ মনে করলেন হাঁসগুলো আসলে শিমরিং লেকের দিকে উড়ে যাচ্ছিল। তবে ফোম লেকের আলো দেখে দিকভ্রষ্ট হয়ে এখানে চলে আসে। তাতেও তারা কীভাবে মারা গেল সেই বিষয়টির সমাধান হয়নি।

বাফেলহেড একটি ছোট সামুদ্রিক হাঁস। এটি কানাডার বোরিয়াল বনের গাছগুলোতে প্রজনন করে থাকে এবং শীতকাল এর পাশের উপকূলবর্তী পানিতেই কাটায়। একে ‘স্পিরিট ডাক’ বলেও ডাকা হয়। পুরুষ হাঁসটি সাদা-কালো হয়ে থাকে এবং এর মাথায় চিত্রাভ দাগ থাকে যা বিভিন্ন দিক থেকে বিভিন্ন বর্ণের দেখায়। মাথায় ভিন্ন রকমের রং থাকার কারণেই একে বাফেলহেড হাঁস বলা হয়ে থাকে। তবে বাফেল শব্দটি এসেছে বাফেলো এবং হেড এর সংমিশ্রণে।

বাফেলহেড হাঁস আসলে পরিযায়ী পাখি। এরা প্রজননের সময় পশ্চিম আমেরিকা, কানাডা এবং আলাস্কার বোরিয়াল ফরেস্ট এবং অ্যাস্পেন পার্কল্যান্ডে বসবাস করে। এরা সাধারণত পানিতে ডুব দিয়ে খাবার সংগ্রহ করে। এদের খাবারের তালিকায় রয়েছে জলজ অমেরুদন্ডী প্রাণী, ক্রাস্টেসিয়ানস এবং মলাস্ক। পানির নিচে থাকা অবস্থাতেই এরা খাবার খেয়ে থাকে। এক ডুবে এরা ১২-২৫ সেকেন্ড পর্যন্ত জলের নিচে থাকে। উপরে উঠে ১২ সেকেন্ডের মতো থেকে আবার ডুব দেয়। তবে জলের উপরে ভাসমান পোকা এবং পতঙ্গও খেয়ে থাকে।

যেসব হাঁস প্রজনন শেষে প্রজনন ক্ষেত্র ছেড়ে চলে যায় তাদের মধ্যে বাফেলহেড অন্যতম। এরা যখন স্থান পরিবর্তনের প্রস্তুতি নেয় তার আগে এত বেশি পরিমাণে খাবার খেয়ে থাকে যে এদের শরীরের ওজন আরো ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। তবে এরা বেশ সময়নিষ্ঠ পরিযায়ী পাখি। প্রতি বছর নির্দিষ্ট সময়ে এরা শীতের আবাসভূমিতে চলে আসে। সিডনিতে ১৫ অক্টোবর হচ্ছে বাফেলহেড হাঁস দিবস। শীতের সময় এরা লেকে পৌঁছাতে সমুদ্রের দেড় কিলোমিটার উপর দিয়ে ঘন্টায় ৬৫ কিলোমিটারেরও বেশি গতিতে ছুটে চলে। মাঝে মাঝে তা ১০০ কিলোমিটার পর্যন্তও হয়ে থাকে।

এরপর বিশ্বযুদ্ধের আলোচনায় এই হাঁস বৃষ্টির বিষয়টি একরকম চাপা পড়ে যায়। পরে এই বিষয় আবার আলোচনায় নিয়ে আসেন কেরি ফিনলে। তিনি সাসকাচোয়ানের লুসল্যান্ডের মানুষ। ছোটবেলা থেকেই বাবার সাথে এই এলাকা দেখে বড় হয়েছেন এবং এর পরিবেশ সম্পর্কে তার ধারণা গাঢ় হয়েছে। কেরি ১৯৭০ এবং ১৯৮০ এর দশকে আর্কটিকে জীববিজ্ঞানী হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি ব্রিটিশ কলম্বিয়ার সিডনিতে স্থায়ী হওয়ার আগে বাফিন বে-তে ‘বোহেড তিমি’ বিশেষজ্ঞ হয়ে ওঠেন।

ছোটবেলাতেই তিনি এই হাঁস সম্পর্কে জেনেছেন এবং তার ক্যারিয়ারেও এই বাফেলহেড হাঁস নিয়েও কাজ করতে হয়েছে। ফলে তিনি ১৯৪০ সালের সেই রাতের হাঁস-বৃষ্টির বিষয়ে গবেষণা করতে আগ্রহী হন। এর রহস্য উদঘাটন করতে তিনি প্রায় ১৬ বছর ব্যয় করেন এবং গ্রহণযোগ্য একটি কারণ খুঁজে পান।

কেরি ১৯৭০ এবং ১৯৮০ এর দশকে আর্কটিকে জীববিজ্ঞানী হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি ব্রিটিশ কলম্বিয়ার সিডনিতে স্থায়ী হওয়ার আগে বাফিন বে-তে ‘বোহেড তিমি’ বিশেষজ্ঞ হয়ে ওঠেন। এই হাঁস বৃষ্টির কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে কেরি বলেন ১৯৪০ সালের নভেম্বর মাসে বিশ্বজুড়ে অতিরিক্ত শীত পড়েছিল। কানাডার ওই অঞ্চলে অতিরিক্ত শীতের কারণে সেই বছর একটি আস্ত ব্রিজ বরফ জমে ভেঙে পড়ে। এর এক সপ্তাহ পরে ১১ নভেম্বর আমেরিকান মিডওয়েস্টে এক ভয়াবহ তুষারপাত হয় যার কারণে ১০০ জনেরও বেশি লোক হতাহত হয়।

হাঁসগুলো যে শুধু ফোম লেকে আছড়ে পরেছিল, তা কিন্তু নয়। আশেপাশের অনেক জায়গাতে এই হাঁসগুলো মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। হাঁসগুলো আরো অন্যান্য গ্রামীণ অঞ্চলেও পড়েছিল যেখানে কোনো বিদ্যুতের আলো ছিলো না। ফলে হাঁসগুলো যদিও ফোম লেকের আলো দেখেই এসব এলাকায় আসতো তাহলে সেসব বিদ্যুতহীন গ্রামীণ এলাকায় তাদের যাওয়ার কথা না এবং সেখানে তাদের মৃতদেহ পাওয়ার কথা না। তাই কেরি আরো বিস্তর গবেষণা করতে চাইলেন।

কেরি ফিনলে তার গবেষণা রিপোর্টে জানান বাফেলহেড হাঁসগুলো নিয়ম মতো ওই রাতে ফোম লেক অঞ্চল দিয়ে উড়ে যাচ্ছিল। তবে অতিরিক্ত খাওয়ার কারণে তাদের শরীরের ওজন এমনিতেই বেশি ছিল। তার ওপর অতিরিক্ত ঠাণ্ডার কারণে উড়ন্ত অবস্থায় তাদের পাখনায় বরফ জমে যায়। পাখনায় বরফ জমে যাওয়ার কারণে এবং অতিরিক্ত ঠাণ্ডায় আকাশেই এই হাঁসগুলো মারা যায়। তারপর নিচে পড়ে।

বাফেলহেড হাঁসের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, এরা যেখানে ডিম পাড়ে সেখানে আর থাকে না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল বাফেলহেড হাঁসেরা স্থান পরিবর্তন করার সময় এতটাই বেশি খাবার খায় যে তাদের শরীরের ওজন ২৫ শতাংশ বেড়ে যায়। যে কারণে শরীরের বাড়তি ওজন নিয়ে বেশিক্ষণ উড়তে পারে না। আবার হতে পারে খারাপ আবহাওয়ার কারণেই হাঁসগুলো মারা গিয়েছিল।