সবাইকে জাগিয়ে আগুন থেকে বাঁচিয়ে মারা গেলেন ‘প্রহরী’ রাসেল

পুরান ঢাকার আরমানিটোলা খেলার মাঠ সংলগ্ন আরমানিয়ান স্ট্রিট আরমানিটোলার হাজী মুসা ম্যানশনে অগ্নিকাণ্ডে সবাইকে জাগিয়ে প্রহরী রাসেল চলে গেলেন না ফেরার দেশে।

জানা যায়, আনুমানিক রাত আড়াইটার দিকে হাজী মুসা ম্যানশনে আগুন লাগলে ভবনের প্রহরী রাসেল ভবনের প্রতিটি ফ্লোরে গিয়ে কলিং বেল চেপে, দরজা পিটিয়ে আগুনের খবর দেয়।

পরে আগুন নেভানোর জন্য সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে আসেন রাসেল। অনেকক্ষণ পানি দিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টাও করেন। পরবর্তীকালে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা রাসলকে সিঁড়ি থেকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করেন।

প্রত্যক্ষদর্শী হেনা ইসলাম বলেন, আমরা ঘুমিয়ে ছিলাম। হঠাৎ কলিং বেলের শব্দ পেয়ে গেট খুলতেই দেখি ধোঁয়া আর গ্যাসের গন্ধ। তখন রাসেল বলছে চাচি ভবনে কেমিক্যাল গুদামে আগুন লাগছে। দ্রুত বের হয়ে ছাদে যান। বললাম তুমি কই যাচ্ছো রাসেল বললো সবাইকে জাগিয়ে দিয়েছি। এখন আগুন নেভাতে যাচ্ছি। এই বলে রাসেল সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে যায়।

তিনি বলেন, আমাদের ৬ জনের পরিবার যে যেভাবে ছিলাম সেভাবেই ছাদে যেতে চাইলে ধোঁয়া আর কেমিক্যালের গ্যাসে দম বন্ধ হওয়ার মতো অবস্থা। আমরা রুমে গিয়ে বারান্দার গ্রিল ভেঙে পাশের বাড়ি দিয়ে সহায়তা চাইলে তারা। সিড়ির ব্যবস্থা করে। পরে ফায়ার সার্ভিসের লোকজন এসে আমাদের উদ্ধার করে। প্রথমে আমি বাচ্চাদের দিয়ে রাসেলকে ডাকতে সিঁড়ির দিকে গিয়ে রাসলকে ডাকলে কোনো সাড়া না পেয়ে আমিও চলে আসি। আমার সাহেব গ্রিল ভাঙতে গিয়ে হাত ভেঙে গেছে ও কয়েক স্থানে কেটে গেছে। তিনি এখন হাসপাতালে। এছাড়া আমার পরিবারের সবাই সুস্থ আছে। কিন্তু মনের ভিতরে আতঙ্ক রয়ে গেছে। সকালে আগুন নেভানোর পর সিঁড়ি থেকে রাসেলের মরদেহ উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা।

এ সময় হেনা ইসলাম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, রাসেল খুব ভালো ছেলে ছিলো বাবা। তা না হলে জীবনের মায়াত্যাগ করে সে বাড়ির সকলকে ডেকে উঠিয়েছে। আগুন নেভানোর চেষ্টা করেছে। আমরা যখন ছাদে যাওয়ার চেষ্টা করছিলাম তখন রাসেলকে বললাম তুমি কোথায় যাও বললো চাচি আমি দেখি আগুন নেভানোর কোনো রাস্তা পাই কিনা বলে নিচে চলে গেলো। তারপর আর কিছুই বলতে পারবো না। আমাদের জাগিয়ে নিজেই না ফেরার দেশে চলে গেলো। আল্লাহ তাকে বেহেস্ত নসিব করুন।

অপর একজন ভবনের ষষ্ঠ তলার বাসিন্দা সাহাদাত হোসেন বলেন, রাসেল না থাকলে আমরা হয়তো আজ বাঁচতে পারতাম না। আমরা সেহেরির জন্য ঘুম থেকে উঠবো উঠবো ভাব। তখন রাসেল গিয়ে দরজা পিটিয়ে আমাকে জানালো কাকা ভবনে আগুন লাগছে দ্রুত ছাদ দিয়ে বাইরে চলে যান। বলে নিচে চলে আসে রাসেল। আমরা ছাদে উঠে পাশের বিল্ডিং দিয়ে নিচে নেমে আসি। সকালে শুনি রাসেল ও তার ফুপা ওয়ালিউল্লাহ বেপারী মারা গেছেন।

এদিকে, সকালে আরমানিয়ান স্ট্রিট আরমানিটোলার হাজী মুসা ম্যানশনের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে উপ-সহকারী পরিচারক বজলুর রশিদ বলেন, আমরা ৬টা ১০ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে এনেছি। এখন শুধু ধোঁয়া বের হচ্ছে, এই ধোঁয়া বন্ধ করতে পর্যাপ্ত পানি দেওয়া হচ্ছে। ভবনের ভিতরে এখনও অনেক উচ্চ দাহ্য পদার্থ রয়েছে। আমরা এ পর্যন্ত ৬ তলা থেকে সবাইকে উদ্ধার করা হয়েছে। আমাদের দৃষ্টিতে ভবন ঝুঁকিপূর্ণ। এখন পর্যন্ত কাউকে উঠতে দিচ্ছি না। আমাদের ফায়ার ফাইট মোটামুটি শেষ। এখন ডেম্পিং চলছে। এখানে কাজ করতে আসাদের চারজন কর্মী আহত হয়েছেন।

কেমিক্যাল সরানোর ক্ষেত্রে আপনারা কাজ করবেন না কি অন্য কোনো সংস্থা কাজ করবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, পুরান ঢাকার প্রায় প্রতিটি ভবনের নিচেই কেমিক্যালের গোডাউন। আমরা শত শত বার বলা ও প্রতিবেদন দেওয়া শর্তেও এখানে কেমিক্যাল গোডাউন সরানো যাচ্ছে না। নিচে কেমিক্যাল উপরে বাসা বাড়ি এটা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এই ভবনের নিচ তলারও দ্বিতীয় তলায় প্রতিটা রুম কেমিক্যালের গোডাউন। এছাড়া তিন, চার, পাঁচ ও ছয় তলায় বাসা বাড়ি। অত্যন্ত ঝুঁকির মধ্যে এরা বসবাস করছে।

আগুনের সূত্রপাত কিভাবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের ডিপার্টমেন্ট থেকে ইতোমধ্যে ৪ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই মুহুর্তে বলা যাচ্ছে না আগুনের সূত্রপাত কোথা থেকে। তদন্ত সাপেক্ষে বলা যাবে। কমিটি দ্রুত কাজ শুরু করবে।

উল্লেখ্য, আরমানিটোলা খেলার মাঠ সংলগ্ন আরমানিয়ান স্ট্রিট আরমানিটোলার হাজী মুসা ম্যানশনের ছয়তলা ভবনের নিচতলায় কেমিক্যাল গোডাউনে আগুন লেগে নারীসহ চারজনের মৃত্যু হয়েছে। এতে দগ্ধ ও ধোঁয়ার কারণে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন অন্তত ২১ জন। আনুমানিক রাত আড়াইটার দিকে এই লাগলে ফায়ার সার্ভিসের ১৫টি ইউনিট কাজ করে ভোর সোয়া ৬টার দিকে আগুণ নিয়ন্ত্রণে আনে।